সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী স. এর অবদান

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন মহান সমাজ সংস্কারক। প্রাক- ইসলামী যুগে আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। গোত্র কলহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি, হানাহানি, সামাজিক বিশৃঙ্খলার নৈরাজ্য পূর্ণ অবস্থার মধ্যে নিপতিত ছিল গোটা সমাজ। সামাজিক সাম্য- শৃঙ্খলা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, নারীর মর্যাদা ইত্যাদির কোনো বালাই ছিল না। জঘন্য দাসত্ব প্রথা, সুদ, ঘুষ, জুয়া মদ, লুন্ঠন, ব্যভিচার, পাপাচার, অন্যায়- অত্যাচারের চরম তাণ্ডবতায় সমাজ কাঠামো ধসে পড়েছিল, এমন এক দুর্যোগময় যুগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব। তিনি অল্পদিনের মধ্যেই জাহেলি সমাজের অশান্তি দূর করে শান্তিময় আদর্শ সমাজ গঠন করেছিলেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা যাকে গোটা বিশ্বের জন্য রহমাত হিসেবে পাঠিয়েছেন তিনি তো শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা বাহক হবেনই। মহান আল্লাহর বাণী-

وَمَآ أَرْسَلْنٰكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعٰلَمِينَ

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়-১০৭)

মহানবী স. সমাজের অশান্তি দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন :

হিলফুল ফুজুল :

মুহাম্মদ (সা.) তখন কিশোর। আরবের বিখ্যাত ওকাজ মেলায় জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে কুরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ বছর চলতে থাকা এই যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধের বিভীষিকায় কিশোর মুহাম্মদের কোমল হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তাই নবুয়্যত পাওয়ারও পনেরো বছর আগে পঁচিশ বছর বয়সে সমমনা যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলেন হিলফুল ফুজুল নামে স্বেচ্ছাসেবী শান্তিকামী সংগঠন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে বিশ্বাসী আরব সমাজে শুরু হল শান্তির পতাকাবাহী একদল যুবকের পদচারণা। অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদে আলোর মশাল নিয়ে হাজির হলেন এসব যুবক।

প্রতিষ্ঠার অন্য একটি পটভূমির কথাও জানা যায় এবং তা হচ্ছে, জুবাইদ নামক একজন লোক মক্কায় এসেছিলেন কিছু মালপত্র নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে। আস বিন ওয়ায়িল সাহমী তাঁর নিকট থেকে মালপত্র ক্রয় করেন কিন্তু তাঁর প্রাপ্য তাঁকে না দিয়ে তা আটক রাখেন। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্যের জন্য তিনি আব্দুদ্দার, মাখযুম, জুমাহ, সাহম এবং আদী এ সকল গোত্রের নিকট সাহায্যের আবেদন জানান। কিন্তু তাঁর আবেদনের প্রতি কেউই কর্ণপাত না করায় তিনি জাবালে আবূ কুবাইশ পর্বতের চূড়ায় উঠে উচ্চ কণ্ঠে কিছু কবিতা আবৃত্তি করেন যার মধ্যে তাঁর নিজের অত্যাচার-উৎপীড়নের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টিও বর্ণিত ছিল। আবৃত্তি শ্রবণ করে জুবাইর বিন আব্দুল মুত্তালিব দৌড়ে গিয়ে বলেন, ‘এ লোকটি অসহায় এবং সহায় সম্বলহীন কেন? তাঁরই অর্থাৎ জুবাইরের প্রচেষ্টায় কতিপয় যুবক ‘যার মধ্যে মুহাম্মাদ স. ছিলেন অন্যতম’ একত্রিত হয়ে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন (যে চুক্তির নাম হিলফুল ফুজুল) এবং পরে আস বিন ওয়ায়িলের নিকট থেকে জুবাইদের পাওনা আদায় করে দেয়া হয়।’ (মুখতাসারুস সীরাহ ৩০-৩১ পৃঃ)

এ যুব সংঘের কাজ ছিল :

ক. সামাজিক ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
খ. যুদ্ধ বন্ধ করে সম্প্রীতি গড়ার চেষ্টা করা।
গ. অন্যায় ও অবিচার থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
ঘ. নিঃস্ব, বিধবা ও অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো।
ঙ. বিদেশি বণিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া।
চ. সব ধরনের অন্যায় ও অবিচারের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
ছ. সর্বোপরি গোত্র, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার কল্যাণে কাজ করাই ছিল এ সংগঠনের উদ্দেশ্য।

সমাজের শান্তি বিনষ্টের অন্যতম কারণ হলো জুলুম, অন্যায়, অবিচার ছড়িয়ে পড়া। ইনসাফ ও ন্যায় বিচার সমাজ থেকে নির্বাসিত হওয়া। এজন্য ইসলামে জলুমের মূলে কুঠারাঘাত করে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার তাকিদ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী-

وَلَا تَرْكَنُوٓا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَآءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ

আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না। (সূরা হুদ-১১৩)

عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ سَالِمًا، أَخْبَرَهُ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لاَ يَظْلِمُهُ وَلاَ يُسْلِمُهُ، وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুল্ম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। (বুখারী-২৪৪২)

عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا ‏”‏‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا، فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ ‏”‏ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে যালিম হোক অথবা মাযলুম। তিনি (আনাস) বললেন, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ! মাযলুমকে সাহায্য করব, তা তো বুঝলাম। কিন্তু যালিমকে কি করে সাহায্য করবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমি তার হাত ধরে তাকে বিরত রাখবে। (অর্থাৎ তাকে যুলুম করতে দিবে না)। (বুখারী-২৪৪৪)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ الظُّلْمُ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যুল্ম কিয়ামতের দিন অনেক অন্ধকারের রূপ ধারণ করবে। (বুখারী-২৪৪৭)

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ، فَقَالَ ‏ “‏ اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ

‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যুল্ম কিয়ামতের দিন অনেক অন্ধকারের রূপ ধারণ করবে। (বুখারী-২৪৪৮)

নিখিল বিশ্বের তরুণ মুহাম্মদ বিশ্ব-তরুণদের জন্য এই অধ্যায়ে কি সুন্দর আদর্শই না রেখে গেলেন। দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা, গরীব দুঃখীকে সাহায্য করা, সাম্প্রদায়িকতা বিসর্জন দিয়ে আপন-পর, দেশী-বিদেশী নির্বিশেষে সমভাবে সকলের সেবা করা, অত্যাচারীকে বাধা দেওয়া, উৎপীড়িতের সহায়তা করাই হল তরুণের কর্তব্য। তরুণ জাগ্রত হও, চোখ খোল, ঐ দেখ, তোমার মহান আদর্শ- তরুণ মুহাম্মদ সংঘবদ্ধ হয়ে সহকর্মীদিগকে নিয়ে কি করছেন? কোথায় কোন্ পিতৃহীন য়্যাতীম ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে, কোথায় কোন নিঃসহায় বিধবা নারী অন্ন-বস্ত্রের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে, কোথায় কোন্ শয্যাশায়ী দুঃস্থ রুগ্ন পরিচর্যার অভাবে আর্তনাদ করছে, কোথায় কোন্ বিদেশী পথিক কোন্ দুর্বৃত্ত কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে তিনি তাই অনুসন্ধান করছেন । মূর্ত শান্তির প্রতিক তরুণ মুহাম্মদ কোথাও বা কোন অনাথ শিশুকে কোলে নিয়ে দোলা দিচছেন, কোথাও বা রোগীর শয্যাপার্শ্বে বসে তার পরিচর্যা করছেন, কোথাও বা কোন জনহিতকর কাজে আত্মনিয়োগ করে সমাজ-সেবার কর্তব্য পালন করছেন। এই তরুণকেই আমরা কামনা করি, আমাদের দেশ কামনা করে, সারা বিশ্ব কামনা করে।

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফল সংঘ ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তারপর এই সেবা সংঘ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল। কারণ, সর্ব প্রকার অন্যায়, অমঙ্গল ও পাপের মূলোৎপাটন করার এবং সর্বধিক ন্যায়, মঙ্গল ও পুণ্য সাধনের দায়িত্ব নিয়ে যখন ‘ইসলাম’ আত্মপ্রকাশ করল তখন আর উক্ত সেবা-সংঘের কোন প্রয়োজনই রইল না। পূর্ব আকাশের উদয়-তোরণে বিকশিত প্রভাতের ক্ষীণ তন্ত্র আলো যেমন সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস স্বরূপ, সেবা সংঘের শান্তি বিধানও ছিল তদ্রূপ ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বাভাস স্বরূপ। দিবাকর উদয়াচলে যাত্রা করলে যেভাবে প্রভাতের ক্ষীণ আলো বিলুপ্ত হয়ে যায়, ইসলামের আত্মপ্রকাশেও সেবা সংঘ সেই ভাবেই নিষ্ক্রিয় ও বাতিল হয়ে গেল।

হিলফুল ফুজুলের সুফল

কাসেম বিন সাবেত বর্ণনা করেন, খাসআম গোত্রের এক ব্যক্তি হজ্জ অথবা উমরা পালন করতে এলো। সাথে সুন্দরী রূপবতী কন্যাও ছিল। নুবাইহ বিন হাজ্জাজ সাহমী তাকে অপহরণ করে লুকিয়ে ফেলল। খাসআমী ফরিয়াদ করতে লাগল, আমাকে ওই ব্যক্তির অনাচার থেকে কে রক্ষা করবে? কেউ তাকে জানান, হিলফুল ফুজুলের দোহাই দিয়ে সাহায্য তলব করো। তুমি অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে। সে হিলফুল ফুজুলের দোহাই দিয়ে ফরিয়াদ করতেই চতুর্দিক হতে মানুষ অস্ত্র নিয়ে তার সাহায্যে হাজির হয়ে গেল। তারা জিজ্ঞাসা করল, ‘বলো, কী হয়েছে?’ সে বলল, নুবাইহ বিন হাজ্জাজ আমার কন্যাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে তার ঘরে আটকে রেখেছে। আমার কন্যাকে তার থাবা থেকে উদ্ধার করে দাও। তারা সবাই তার সাথে সাথে গেল। নুবাইহের দরোজায় করাঘাত করল। সে বাইরে বেরিয়ে আসতেই লোকেরা বলল, ‘তার কন্যাকে অতি দ্রুত তার কাছে ফিরিয়ে দাও। তুমি জানো না, আমরা কারা এবং কী বিষয়ে চুক্তি করেছি?’ সে বলতে লাগল, ‘আমি তাকে ফেরত দিচ্ছি, শুধু একটি রাত তাকে আমার কাছে থাকতে দাও।’ লোকেরা বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমরা তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও অনুমতি দেব না।’ নুবাইহ লোকদের সম্মিলিত দাবীর কাছে অপারগ হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো এবং অপহৃতাকে ছেড়ে দিল।’ (সিরাত বিশ্বকোষ ২/২৮১)

মদীনা সনদের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা :

মদীনাবাসী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মনোভাব বুঝতে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন বেগ পেতে হল না। ভাবলেন, এই লোকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। নতুবা মদীনার কল্যাণ নাই। দেশের স্বার্থ ও শান্তি নির্ভর করে অধিবাসীদের সংহতি ও ঐক্যের উপর। যে দেশে বিভিন্ন জাতির বাস, সে দেশে পরমতসহিষ্ণুতার প্রয়োজন অত্যন্ত বেশী। নিজেও বাচতে হবে, অপরকেও বাঁচতে দিতে হবে, তবেই নাগরিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। মক্কার কুরায়শদের নিকট মুসলমানগণ এই অধিকার পান নি। তাই মদীনায় এসে তিনি এর আবশ্যকতা বিশেষভাবে অনুভব করলেন। ইয়াহুদী ও পৌত্তলিকদিগের সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে দেশে শান্তির ব্যবস্থা করার জন্য তাঁর মন উদগ্রীব হয়ে উঠল ।

এতদুদ্দেশ্যে তিনি সব সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে আহ্বান করে একটি সম্মেলন করলেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রীতি ও সংহতির প্রয়োজনীয়তা সকলকে বুঝিয়া দিলেন। অতপর এই শুভ উদ্দেশ্যে সকল সম্প্রদায়ের সম্মতি পেয়ে তিনি একটি সনদ বা আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ সধমহধপযধৎঃধ) লিখিয়ে নিলেন।

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-ই জগতে সর্বপ্রথম এই আদর্শ স্থাপন করলেন। এই আন্তর্জাতিক সনদে আনসার, মুহাজির এবং অন্যান্য মুসফলমানদের পরস্পরের সম্বন্ধ ও স্বত্বাধিকার এবং তাঁদের সামাজিক সমস্ত বিষয়ের শাসন ও বিচারের বিধি ব্যবস্থা প্রথমেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। অতপর মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে য়াহুদী ও পৌত্তলিকদের মধ্যে এবং এদের প্রত্যেক সম্প্রদায় ও গোত্রের মধ্যে পরস্পর কি সম্বন্ধ ও স্বত্বাধিকার থাকবে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উল্লেখ করা হয়েছিল। ইবন ইসহাক এই চুক্তিপত্রটি তাঁহার সীরত গ্রন্থে আদ্যোপান্ত নকল করেছেন।
এই চুক্তিপত্রে ধর্ম সম্বন্ধে সকল সম্প্রদায়কেই পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। যে সমস্ত শর্ত লিখিত হয়েছিল, তার মধ্য হতে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে উদ্ধৃত করছি।

১. মদীনার পৌত্তলিক, ইয়াহুদী, এবং মুসলমান সকলেই এক উম্মৎ (ঘধঃরড়হ)।
২. এই সাধারণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত জাতিসমূহ সকলেই ধর্ম সম্বন্ধে স্বাধীন থাকিবে, কেহই কাহারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করিবে না।
৩. এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত কোন সম্প্রদায় শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হইলে সকলে সম্মিলিতভাবে তাহা প্রতিহত করিবে।
৪. প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মিত্র জাতিসমূহের স্বত্ত্বাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করিতে হবে।
৫.মদীনা আক্রান্ত হইলে সকলে মিলিয়া যুদ্ধ করিবে এবং প্রত্যেক স¤পদায়্র নিজেদের যুদ্ধবায় নিজেরা বহন করিবে।
৬. উৎপীড়িতকে রক্ষা করিতে হইবে
৭. মদীনায় রক্তপাত করা আজ হইতে ‘হারাম’ বলিয়া গণ্য হইবে।
৮. দিয়ত বা খুনের বিনিময়পণ পূর্ববৎ বহাল থাকিবে।
৯.’কোন সম্প্রদায় বাহিরের কোন শত্রুর সাহিত গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইবে না।
১০.নিজেদের মধ্যে কেহ বিদ্রোহী হইলে অথবা শত্রুর সহিত কোন প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলে তাহার সমুচিত শাস্তি বিধান করা হইবে সে যদি তাহার পুত্রও হয়, তবুও ক্ষমা করা হইবে না।
১১.কোন সম্প্রদায় কুরায়শদিগের সহিত কোন প্রকার গোপন সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইবে না, কেহ তাহাদের কোন লোককে আশ্রয় দিবে না।
১২. অমুসলমানদের মধ্যে কেহ অপরাধ করিলে তাহা ব্যক্তিগত অপরাধ বলিয়া গন্য হইবে ।
১৩. মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এই সাধারণতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী নির্বাচিত হইলেন । যে সকল বিষয়ের মীমাংসা সাধারণভাবে না হয় সেইগুলির মীমাংসা তাঁহার উপর ন্যস্ত থাকবে। তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মীমাংসা করিয়া নিবেন।
১৪. যাহারা এই চুক্তি ভঙ্গ করিবে তাহাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাৎ।

এই চুক্তিপত্রে সকল সম্প্রদায়ের লোকেই সাক্ষর করেছিল। কিন্তু পৌত্তলিক, মুনাফিক এবং য়্যাহুদীগণ এই চুক্তি ভঙ্গ করে আল্লাহর অভিশাপে অভিশপ্ত হয়েছিল । (ইবন হিশাম,পৃষ্ঠা নং ৫০২-৫০৩, মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃষ্ঠা নং ৪৪২-৪৪৩)

মদিনা সনদ হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তার প্রণীত সনদ নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয়সহিষ্ণুতা ঘোষণা করে। তাই একে ইসলামের ‘মহাসনদ’ বলা হয়। মদিনা সনদে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। গোত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত না করে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে এ সনদ উদারতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে। এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত মদিনা সনদ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করে।

মদিনা সনদের দ্বারা হজরতের উপর মদিনার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব অর্পিত হয়। কুরাইশদের বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এটি তার ক্ষমতা ও মর্যাদাকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করে। সনদের শর্ত ভঙ্গ করার অপরাধে নবী করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কৃত করেন। এ সনদে সংঘর্ষ-বিক্ষুব্ধ মদিনার পুনর্গঠনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনাও এতে ছিল। মদিনা সনদ দ্বারা এটিও প্রমাণিত হয়, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞও ছিলেন।

মদিনা সনদ মদিনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। প্রথমত, এ সনদ রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর শহর শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রাসূলের দেয়া নতুন সংবিধান অনুযায়ী এটি গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্যের স্থলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। তিনি মদিনার প্রত্যেক মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন।
তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিককে এ সনদ সমানাধিকার দান করে।
চতুর্থত, এটি মদিনার মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে এবং মুহাজিরদের মদিনায় বসবাসের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে।
পঞ্চমত, মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এ সনদ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।

মদিনা সনদ গোত্র বা গোষ্ঠীগত চুক্তি হয়েও তা সর্বজনীনতা লাভ করেছে। এই চুক্তি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্মবিদ্বেষ, অঞ্চলপ্রীতির নামে কর্তৃত্ব মূলত মানবতার শত্রু ও প্রগতির অন্তরায় সব রকম প্রয়াস খতম করে সাফল্যের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ ও দায়িত্ব কর্তব্যের বিবরণসংবলিত এক অনন্য দলিল। এ দলিল পর্যালোচনা করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর মানবাধিকার ঘোষণার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রতিভাত। বলা হয়, এই মদিনা সনদের ধারাবাহিকতা ধরেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পরবর্তী যুগে যথাক্রমে ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কার্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার’ ঘোষিত হয়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই দলিলকে ‘মন্টোগোমারি ওয়াট’ তার ‘মুহাম্মদ এট মদিনা’ গ্রন্থে বলেছেন, ঞযব ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ ড়ভ গধফরহধ অর্থাৎ মদিনার সংবিধান।

হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা :

শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর আরো একটি কীর্তি হচ্ছে হুদায়বিয়ার সন্ধি। আপাতদৃষ্টিতে নতজানু সন্ধি মনে করে প্রিয় সাহাবিরা মনস্তাত্ত্বিক কারণেই মর্মাহত হয়ে পড়েন কিন্তু মহান আল্লাহ স্বয়ং একে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এ ধরনের একটি আপসচুক্তি ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। যে কুরাইশরা এতগুলো মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে, যারা মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, যারা তখনো তাদেরকে কা‘বা শরিফে ঢুকতে দেয়নি এবং বহন করে আনা কোরবানির জন্তুগুলোকেও ফিরিয়ে দিচ্ছিল- এহেন কপট, যুদ্ধবাজ আগ্রাসী মুশরিকদের এমন আকস্মিকভাবে সন্ধি ও সমঝোতায় নিয়ে আসা নবীজী স. এর জন্য একটি প্রাথমিক বিজয় ছিল, যা পরবর্তীতে আরো বৃহত্তর বিজয় ডেকে নিয়ে আসে। দূরদর্শী মহামানব এই সন্ধিপত্রে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও বৃহত্তম স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতম স্বার্থের বিসর্জন হিসেবে মেনে নিয়ে এক চরম রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি থেকে মানবতাকে রক্ষা করেন। সন্ধির শর্তগুলো লক্ষ করলেই বুঝা যায় রসূল স. যুদ্ধ এড়াতে কত উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।

হুদায়বিয়া সন্ধির শর্ত সমূহ :

১. কুরাইশ ও মুসলমানরা সমগ্র আরব ভূ-খণ্ডে সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে এ মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে যে, দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না ও পরস্পরের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হতে বিরত থাকবে।
২. যদি কুরাইশদের কেউ তাদের অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে যায় ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়, মুহাম্মদ অবশ্যই তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু যদি কোন মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসে, কুরাইশরা তাকে মুসলমানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়।
৩. মুসলমান ও কুরাইশরা স্বাধীনভাবে যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন।
৪. মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীগণ এ বছর এখান থেকেই মদীনায় ফিরে যাবেন। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোয় স্বাধীনভাবে মক্কায় গিয়ে হজ্ব বা উমরা পালন করতে পারবেন। তবে শর্ত হলো এই যে, তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবেন না ও সঙ্গে সাধারণত একজন মুসাফির যাত্রী যে ধরনের তরবারি বহন করে, তা ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবেন না।
৫. মক্কার মুসলমানরা এ চুক্তির অধীনে মক্কায় স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবেন এবং এক্ষেত্রে কুরাইশরা তাদের বাধা দিতে পারবে না। তাঁদের ধর্মান্তরিত করা ও মুসলমান হওয়ার কারণে তিরস্কার করতে পারবে না।
৬. চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় একে অপরের ধন-সম্পদ সম্মানিত মনে করবেন এবং বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিতে পরস্পরকে দেখতে ও প্রতারণা করতে পারবেন না।
৭. যেসব মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় আসবেন, তাঁদের জীবন ও ধন-সম্পদের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হবে।

পারতপক্ষে নিজে ঠকে যেই চুক্তি সংগঠিত হয়েছিলো, তা হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) এর অনবদ্য ভূমিকার অনন্য স্মারক এই হুদায়বিয়ার সন্ধি। আল্লাহর রাসুল সাহাবিদের প্রবল মনোরোষ ও বিরোধিতা সত্ত্বেও কোরাইশদের সঙ্গে এক অসম চুক্তিতে উপনীত হলেন। বাহ্যিক পরাজয়মূলক হওয়া সত্ত্বেও কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি এ সন্ধিতে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তির ছয়টি ধারার প্রতিটি ছিল চরম মানবতাবিরোধী ও বৈষম্যমূলক। চরম অপমানজনক ও বিদ্বেষপূর্ণ। চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে সামান্য বোধের মানুষের মনেও প্রশ্নের উদয় হওয়ার কথা, হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেন এমন চুক্তি স্বাক্ষর করলেন? তিনি তা করেছিলেন শুধুই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। বস্তুত অল্প সময়ের মধ্যেই তা প্রমাণিত হয়েছিল।

মক্কা বিজয়ের পর বিশ্বনবীর ক্ষমা ঘোষণা :

ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। এই সন্ধিতে অনেকগুলো শর্ত ছিল। এই শর্তগুলোর একটি শর্ত ছিল যে, কেউ চাইলে মুসলমানদের আশ্রয়ে আসতে পারে, আবার কেউ চাইলে কাফেরদের আশ্রয়েও যেতে পারে। বনু খুযাআ ও বনু বকর দু’দিকে ভাগ হয়ে যায়। বনু বকর কুরাইশদের সাথে জুড়ে, বনু খুযাআ গিয়ে মিশে মুসলমানদের সাথে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, খ,২ পৃ, ৩৯০)

এ দু’গোত্রের মাঝে নবীজি সা এর জন্মেরও আগ থেকে অনেক পুরনো সংঘাত ছিল। ভাগ হয়ে যাবার পর সেই পুরনো শত্রুতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। বনু বকর সুযোগের সৎ ব্যবহার করল। রাতের আঁধার নেমে এসেছে এমন সময়, বনু বকর (মুসলমানদের মিত্র) বনু খুযাআর উপর হামলে পড়ে। এদিকে কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে৷ সংঘাতে বনু খুযাআর কয়েকজন মারা যায়।

এমনকি বনু বকরের লোকেরা বনু খুযাআকে দৌড়ে হারাম শরিফ পর্যন্ত নিয়ে গেলে খুযাআর লোকজন বলছিল, দেখো, আমরা হারামে এসে গেছি, আমাদের উপাস্য মাবুদের দিকে একটু খেয়াল করো। জবাবে বনু বকর যা বলছিল, আজকের দিনে কোন মাবুদ নেই। বনু বকর, তোমরা আজ প্রাণভরে প্রতিশোধ নাও। এরপর তো আর সুযোগ পাবে না। (যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ খ, ১,পৃ ৪১৯ সীরাতে ইবনে হিশাম, খ২, পৃ ৩৯০)

এখানে বনু বকরকে অস্ত্র সহযোগিতার মাধ্যমে কার্যত কুরাইশরাই চুক্তি ভঙ্গ করে। অথচ এটা ছিল হুদাইবিয়ায় সম্পাদিত চুক্তির স্পষ্ঠ লঙ্ঘন। মাজলুম বনু খুযাআ যেহেতু মুসলমানদের মিত্র, দু’দলের মাঝে পরস্পরকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি ছিল এবং তারা (বনু খুযাআ) আমর ইবনে সালেম আল কুযাঈর মাধ্যমে মুসলমানদের কাছে সাহায্যও কামনা করেছিল, সেহেতু তাদের পক্ষ হয়ে কুরাইশদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিশোধ গ্রহণ একটা নৈতিক দায়িত্ব হিশেবে দেখা দিল। এরপরও রসূল স. শেষ সুযোগ হিশেবে তাদের তিনটি প্রস্তাব দেন। (১) কুরাইশরা রক্তপণ আদায় করবে। (২) না হয়, বনু বকরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। (৩) অথবা, চুক্তি ভঙ্গ কর।

কুরাইশ কাফেররা তৃতীয়টিকেই গ্রহকরল। (যদিও পরবর্তীতে তারা তাদের সিদ্ধান্তের ভুল স্বীকার করেছে, এবং সে ভিত্তিতে নানা কৌশলে পুনরায় সমঝোতা করতে চেয়েছে। কিন্তু এতে তারা সফল হয়নি)।

রসূল স. তাই ৮ম হিজরীর ১০ রমজান বাদ আছর ১০ হাজার মুসলমানের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। (বুখারী, ফাতহুল বারী)

একজন মহানুভব শাসকের দৃষ্টান্ত:

মক্কায় প্রবেশের আগের রাতে রসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে মার্রুয যাহরান (مَرُّ الظَّهْرَانِ) উপত্যকায় অবতরণ করেন এবং প্রত্যেককে পৃথক পৃথকভাবে আগুন জ্বালাতে বলেন। তাতে সমগ্র উপত্যকা দশ হাযার অগ্নিপিন্ডের এক বিশাল আলোক নগরীতে পরিণত হয়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবকে তিনি পাহারাদার বাহিনীর প্রধান নিয়োগ করেন।

মক্কাবাসীদের উপরে আসন্ন বিপদ আঁচ করে হযরত আববাস (রাঃ) অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি মনেপ্রাণে চাচ্ছিলেন যে, উপযুক্ত কোন লোক পেলে তিনি তাকে দিয়ে খবর পাঠাবেন যে, রাসূল (ছাঃ)-এর মক্কায় প্রবেশের পূর্বেই যেন কুরায়েশ নেতারা অনতিবিলম্বে এসে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে আত্মসমর্পণ করে। অতঃপর তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সাদা খচ্চরের উপরে সওয়ার হয়ে রাতের আঁধারে বেরিয়ে পড়েন।

আবু সুফিয়ান গ্রেফতার

কুরায়েশ নেতা আবু সুফিয়ান, হাকীম বিন হেযাম ও বনু খোযা‘আহ নেতা বুদাইল বিন ওয়ারক্বা মুসলমানদের খবর জানার জন্য রাত্রিতে ময়দানে বের হয়ে এসেছিলেন। তারা হঠাৎ গভীর রাতে দিগন্তব্যাপী আগুনের শিখা দেখে হতচকিত হয়ে পড়েন ও একে অপরে নানারূপ আশংকার কথা বলাবলি করতে থাকেন। এমন সময় হযরত আববাস (রাঃ) তাদের কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন ও কাছে এসে বলেন, কি দেখছ, এগুলি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সেনাবাহিনীর জ্বালানো আগুন। একথা শুনে ভীত কম্পিত আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন,فَمَا الْحِيْلَةُ فِدَاك أَبِيْ وَأُمِّيْ ‘তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হৌন- এখন বাঁচার উপায় কি? আববাস (রাঃ) বললেন,وَاللهِ لَئِنْ ظَفِرَ بِكَ لَيَضْرِبَنَّ عُنُقَكَ ‘আল্লাহর কসম! তোমাকে পেয়ে গেলে তিনি অবশ্যই তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন’। অতএব এখুনি আমার খচ্চরের পিছনে উঠে বস এবং চলো রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে আমি তোমার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি’। কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করে আবু সুফিয়ান খচ্চরের পিছনে উঠে বসলেন এবং তার সাথী দু’জন ফিরে গেলেন।

রাসূল (ছাঃ)-এর তাঁবুতে পৌঁছার আগ পর্যন্ত সকলে রাসূল (ছাঃ)-এর সাদা খচ্চর ও তাঁর চাচা আববাসকে দেখে সসম্মানে পথ ছেড়ে দিয়েছে। ওমরের নিকটে পৌঁছলে তিনি উঠে কাছে এলেন এবং পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখেই বলে উঠলেন,أَبُو سُفْيَانَ عَدُوُّ اللهِ ‘আবু সুফিয়ান, আল্লাহর দুশমন! আলহামদুলিল্লাহ কোনরূপ চুক্তি ও অঙ্গীকার ছাড়াই আল্লাহ তোমাকে আমাদের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছেন’। বলেই তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর তাঁবুর দিকে চললেন। আববাস (রাঃ) বলেন, আমিও দ্রুত খচ্চর হাঁকিয়ে দিলাম এবং তার আগেই রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে পৌঁছে গেলাম। অতঃপর তাঁর সম্মুখে বসে গেলাম। ইতিমধ্যে ওমর এসে পৌঁছলেন এবং বললেন,يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذَا أَبُوْ سُفْيَانَ فَدَعْنِيْ أَضْرِبْ عُنُقَهُ ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই সেই আবু সুফিয়ান! আমাকে হুকুম দিন ওর গর্দান উড়িয়ে দেই’। আববাস (রাঃ) তখন রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন,يَا رَسُوْلَ اللهِ، إنِّيْ قَدْ أَجَرْتُهُ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি’। অতঃপর আমি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে উঠে গিয়ে কানে কানে বললাম,وَاللهِ لاَ يُنَاجِيْهِ اللَّيْلَةَ أَحَدٌ دُوْنِيْ ‘আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া অন্য কেউ আজ রাতে আপনার সাথে গোপনে কথা বলবে না’। এরপর ওমর ও আববাসের মধ্যে কিছু বাক্য বিনিময় হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হে আববাস! এঁকে আপনার তাঁবুতে নিয়ে যান। সকালে ওঁকে নিয়ে আমার কাছে আসুন’।

আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ

সকালে তাঁর নিকটে গেলে তিনি আবু সুফিয়ানকে বললেন,وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنْ لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন,بِأَبِيْ أَنْتَ وَأُمِّيْ مَا أَحْلَمَك وَأَكْرَمَك وَأَوْصَلَك لَقَدْ ظَنَنْتُ أَنْ لَوْ كَانَ مَعَ اللهِ إلَهٌ غَيْرُهُ لَقَدْ أَغْنَى شَيْئًا بَعْدُ ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীত হউন! আপনি কতইনা সহনশীল, কতই না সম্মানিত ও কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী। আমি বুঝতে পেরেছি যে, যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহ’লে এতদিন তা আমার কিছু কাজে আসত’। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন,وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنّيْ رَسُوْلُ اللهِ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আমি যে আল্লাহর রাসূল একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হৌন! আপনি কতই না সহনশীল, কতই না সম্মানিত এবং কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী।أَمَّا هَذِهِ فَإِنَّ فِي النَّفْسِ حَتَّى الْآنَ مِنْهَا شَيْئًا ‘কেবল এই ব্যাপারটিতে আমার মনের মধ্যে এখনো কিছুটা সংশয় রয়েছে’। সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে আববাস (রাঃ) তাকে বললেন,وَيْحَكَ أَسْلِمْ وَاشْهَدْ أَنْ لآ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ قَبْلَ أَنْ تُضْرَبَ عُنُقُكَ ‘তোমার ধ্বংস হৌক! গর্দান যাওয়ার পূর্বে ইসলাম কবুল কর এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’। সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফিয়ান কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে ইসলাম কবুল করলেন।

অতঃপর হযরত আববাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!إنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ يُحِبُّ الْفَخْرَ فَاجْعَلْ لَهُ شَيْئًا ‘আবু সুফিয়ান গৌরব প্রিয় মানুষ। অতএব এ ব্যাপারে তাকে কিছু প্রদান করুন’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,نَعَم مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِيْ سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَهُ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ أَلْقَى السَّلاَحَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ فَهُوَ آمِنٌ ‘বেশ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে, সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে দিবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে’। (ইবনু হিশাম ২/৪০৩; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৪১; মুসলিম হা/১৭৮০; আবুদাঊদ হা/৩০২১; মিশকাত হা/৬২১০)

আবু সুফিয়ান তার এই মহানুভায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

আবু সুফিয়াকে ক্ষমার সাথে সাথে ব্যাপকভাবে সবার জন্য এক বিরাট ক্ষমা ঘোষণা করেন। নবীজি সা এখনো মক্কায় প্রবেশ করেননি। আবু সুফিয়ান দৌড়ে মক্কার উপকন্ঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘হে কুরাইশের লোকেরা! মুহাম্মদ আজ বিশাল ও বিপুল শক্তি নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত, যা তোমাদের ধারণার বাইরে। এখন যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নিবে, তারা নিরাপদ। তা শুনে লোকেরা বলাবলি করতে শুরু করে, তোমার ঘরের পরিসরটা-ই বা কতটুকু? তাতে কয়জনের সংকুলান হবে?এরপর, আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরে দরোজা বন্ধ করে থাকবে,তারাও নিরাপদ। মসজিদুল হারামে যারা আশ্রয় নেবে, তারাও নিরাপদ।( ইবনে হিশাম, ২, ৪০৪, যাদুল মাআদ খ ১,পৃ ৪২৩)

রসূল স. এর মক্কায় প্রবেশ :

তিনি মহান। তার আদর্শ মহান। অন্য আর দশজন শাসকের মতো তিনি ঔদ্ধত্য নিয়ে বিজিত ভূমিতে প্রবেশ করেন নি। বিজয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ বৈ অন্য কিছু নয়। রসূল স. মক্কায় যখন প্রবেশ করছেন, তখন বিনয়ের এক অবাককরা দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। তিনি (স.) একটি উটের উপর বসা। পিছনে যায়েদ ইবনে উসামা রা। একজন বিজয়ী শাসক বিজিত অঞ্চলে প্রবেশ করছেন অথচ থুতনি যেনো উটের পিঠ ছুঁয়ে যাবে। (ইবনে কাছীর, ৩,৫৫৪-৫৫৬) মুখে তখন সূরা ফাতহের পাঠ চলমান ছিল।

‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিদূরিত’:

মক্কায় পৌঁছে রাসূল সা বাইতুল্লাহ অভিমুখে রওয়ানা করলেন। কাবা শরিফে (আশপাশসহ) ৩৬০ টি মূর্তি নিথর দাঁড়িয়ে আছে। নবীজি স. বাইতুল্লাহ তওয়াফ করছেন। তার হাতে একটা ধনুক। ধনুক দিয়ে মূর্তিগুলোকে খোঁচা দিচ্ছিলেন, আর অবলা মূর্তিগুলো উল্টে পড়ছিল। তার মুখে তখন এই আয়াতের তিলাওয়াত চলছে,
جاء الحق وزهق الباطل،إن الباطل كان زهوقا
‘সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত, আর নিশ্চয় মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী’। (সূরা ইসরা ৮১) কাবার দেয়ালে টানানো কিছু ছবি, নামিয়ে সেগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হয়। (যাদুল মাআদ, ১ম,৪২৪)

কাবা শরিফের চাবি ও উত্তম ব্যবহারের অনুপম নমুনা :

তওয়াফ শেষে কাবার চাবি রক্ষক উসমান ইবনে তলহাকে ডাকলেন। তার হাত থেকে চাবি নিয়ে তিনি কাবা শরিফের দরোজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। এই উসমানের কাছে হিজরতেরও আগে যখন নবীজি স. চাবি চেয়েছিলেন, তখন সে চাবি দেয়নি। রূঢ় ভাষায় নবীজি স. এর উত্তর দেয় এবং অসম্মানজনক কথা বলে। তখন নবীজি সা বলেছিলেন, একদিন তুমি এই চাবিটি আমার হাতে দেখতে পাবে। সেদিন আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিবো। তখন উসমান আশংকা প্রকাশ করে বলছিলেন, বাস্তবে এমন হলে সেদিন কুরাইশদের জন্য খুবই লাঞ্চনার ব্যাপার হবে। নবীজি বললেন, না, সেদিনটা হবে প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের। একদিন বাস্তবে যে এমনটা ঘটবে, এ ব্যাপারে উসমানের কোন সন্দেহ ছিল না। এবং কথাটা তার অন্তরে গেঁথে যায়। সেই ভবিষ্যৎবাণীর-ই বাস্তবায়ন হতে চলছে আজ।

কাবা শরিফ থেকে বের হবার পর চাবির জন্য আলী রা আবেদন করেন। কিন্তু নবীজি স. জানতে চান, উসমান কোথায়? উসমান আসলে তার হাতে নবীজি সা চাবি দিয়ে বলেন, উছমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ উত্তম ব্যবহার ও বিশ্বস্ততা দেখানোর দিন। এই নাও চাবি। এই চাবি তোমাদের কাছেই থাকবে। একমাত্র জালিম ছাড়া অন্য কেউ তা তোমাদের কাছ থেকে নিতে পারবে না৷ (যাদুল মাআদ,খ ১,পৃ ৪২৫, তাবাকাতে ইবনে সাআদের বরাতে)

ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহানুভতার শিক্ষা: রাসূল সা যখন কাবার ভিতরে ছিলেন, তখন কুরাইশ কাফেররা কাবার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবাই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। কি সিদ্ধান্ত আসে বলা যায় না। এতোটা কাল তার সাথে এতো অমানবিক আচরণ করেছে তারা, কষ্ট দিয়েছে! নিজের কাছে নিজেরাই অপরাধী।

রসূল স. এর ভাষণ ও ক্ষমা ঘোষণা :
১ম দিন তিনি কা‘বাগৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন।-

(১) হামদ ও ছানা শেষে তিনি বলেন,اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لآ إلَه إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ ‘আল্লাহ সবার চেয়ে বড়, আল্লাহ সবার চেয়ে বড়, আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি এক, যাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন। তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং সেনাদল সমূহকে একাই পরাভূত করেছেন’।
(২) أَلاَ كُلُّ مَأْثُرَةٍ أَوْ مَالٍ أَوْ دَمٍ فَهُوَ تَحْتَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ إِلاَّ سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايَةَ الْحَاجِّ ‘শুনে রাখ, সম্মান ও সম্পদের সকল অহংকার এবং রক্তারক্তি আমার এই পদতলে পিষ্ট হ’ল। কেবলমাত্র বায়তুল্লাহর চাবি সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর সম্মানটুকু ছাড়া (অর্থাৎ এ দু’টি দায়িত্ব তোমাদের জন্য বহাল রইল)।
(৩)أَلاَ وَقَتْلُ الْخَطَإِ شِبْهُ الْعَمْدِ السَّوْطُ وَالْعَصَا، فَفِيهِ الدِّيَةُ مُغَلَّظَةً مِائَةٌ مِنَ الْإِبِلِ أَرْبَعُونَ مِنْهَا فِي بُطُونِهَا أَوْلاَدُهَا ‘ভুলক্রমে হত্যা যা লাঠিসোটা দ্বারা হয়ে থাকে, তা ইচ্ছাকৃত হত্যার সমতুল্য। তাকে পূর্ণ রক্তমূল্য দিতে হবে একশ’টি উট। যার মধ্যে ৪০টি হবে গর্ভবতী’। (আবুদাঊদ হা/৪৫৪৭, ছহীহ ইবনু হিববান হা/৩৮২৮)

(৪) অতঃপর বলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، فَالنَّاسُ رَجُلاَنِ : مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُوْ آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ ‘হে জনগণ! আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের অংশ ও পূর্ব পুরুষের অহংকার দূরীভূত করে দিয়েছেন। মানুষ দু’প্রকারের : মুমিন আল্লাহভীরু অথবা পাপাচারী হতভাগা। তোমরা আদম সন্তান। আর আদম ছিলেন মাটির তৈরী’ (আর মাটির কোন অহংকার নেই)। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ ‘হে মানবজাতি! আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী হ’তে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হ’তে পার। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যিনি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং তিনি সবকিছুর খবর রাখেন’। (হুজুরাত ৪৯/১৩)(তিরমিযী হা/৩২৭০; আবু দাউদ হা/৫১১৬; ঐ, মিশকাত হা/৪৮৯৯; ছহীহাহ হা/২৭০০)

(৫) তিনি বললেন,لاَ يُقْتَلُ قُرَشِىٌّ صَبْرًا بَعْدَ هَذَا الْيَوْمِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ‘আজকের দিনের পর কোন কুরায়শীকে আর যুদ্ধাবস্থা ব্যতীত হত্যা করা হবে না’ (মুসলিম হা/১৭৮২)। অর্থাৎ তারা এদিন সবাই মুসলমান হবে এবং কেউ মুরতাদ হবে না। আর অন্যায়ভাবে তাদের কাউকে হত্যা করা হবে না (ঐ, শরহে নববী)। অতঃপর তিনি বলেন,أَقُوْلُ هَذَا وَاسْتَغْفَرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ ‘আমি এগুলি বললাম। অতঃপর আমি আল্লাহর নিকট আমার জন্য ও তোমাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি’ (ছহীহ ইবনু হিববান হা/৩৮২৮)।

(৬) ভাষণ শেষে তিনি সমবেত কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে বলেন,يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ مَا تَرَوْنَ أَنِّي فَاعِلٌ بِكُمْ؟ ‘হে কুরায়েশগণ! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করব বলে তোমরা আশা কর’? সবাই বলে উঠল,خَيْرًا، أَخٌ كَرِيمٌ وَابْنُ أَخٍ كَرِيمٍ ‘উত্তম আচরণ। আপনি দয়ালু ভাই ও দয়ালু ভাইয়ের পুত্র’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,فَإِنّي أَقُولُ لَكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ ‘শোন! আমি তোমাদের সেকথাই বলছি, যেকথা ইউসুফ তার ভাইদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ আর কোন অভিযোগ নেই’ (ইউসুফ ১২/৯২)। যাও তোমরা সবাই মুক্ত’। (ইবনু হিশাম ২/৪১২; যাদুল মা‘আদ ৩/৩৬০; আর-রাহীক্ব ৪০৫ পৃঃ; আল-বিদায়াহ ৪/৩০১)

নবীজির (স.) এই অপূর্ব করুণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত মক্কাবাসী অভিভূত হয়ে পড়ে। সজল নয়নে নির্বাক তাকিয়ে থাকে মহামানবের মুখের দিকে। এমনও কি হতে পারে? জীবনভর যাঁর সঙ্গে শত্রুতা করেছি, চিরতরে শেষ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি, তিনিই আজ এই বদান্যতা, করুণা ও কোমলতা দেখালেন? তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজি (স.)-এর চরণতলে নিজেদের সঁপে দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’
মহানবী (স.)-এর এই সাধারণ ক্ষমা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানোর যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতদিন যারা ছিল তাঁর রক্তপিয়াসী, তারাই হলো এখন দেহরক্ষী। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য মিথ্যার উপর সত্যের জয় হয়। আলোর জয় অন্ধকারের ওপর। এই রক্তপাতহীন বিজয়টি মূলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উদারতার এবং নিষ্টুরতার বিরুদ্ধে মানবতার।